এম. আবদুল হান্নান:
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার অভিযোগ এনে- যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘন, অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাট খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
আজ সোমবার বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) কাছে সাংবাদিক শাহাদাত হোসেন, রাসেল মাহমুদ ও সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ দাবি জানানো হয়।
সম্প্রতি অর্থনীতি বিষয়ক অনলাইন নিউজ পোর্টাল ইকোনমিবাংলা ডটকমের সম্পাদক মোঃ সাইফুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার শাহাদাত হোসেন, বাণিজ্য বার্তার সিনিয়র রিপোর্টার রাসেল মাহমুদ ও পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক এবং দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মোহাম্মদ মাসুদকে আসামী করে চাঁদাবাজির মামলা করে যমুনা লাইফ।
মামলা কি যমুনা লাইফের অবৈধ সিইও বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডলের দমন-পীড়নের হাতিয়ার- এমন প্রশ্ন তুলে আজ আইডিআরএর চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত চিঠিতে সাংবাদিকরা জানান- বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স অন্যতম। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বদরুল আলমের অযোগ্যতা, আইডিআরএ থেকে ঘোষিত অবৈধ সিইও বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডলের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং কোম্পানির অর্থ ও হিসাব বিভাগের ইভিপি মোজাম্মেল হক সরমান সিন্ডিকেটের দাপটে দিন দিন যমুনার সংকট আরো তীব্র হচ্ছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদের মদদপুষ্ট এই বীমা প্রতিষ্ঠান আইন লঙ্ঘন, আইডিআরএ’র প্রজ্ঞাপন অবজ্ঞা, ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি, অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, প্রতারণা, গ্রাহক হয়রানি আর অযোগ্য নেতৃত্বে এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের স্বাক্ষর জাল হতে শুরু করে চট্টগ্রামে এফডিআর কেলেংকারির মাধ্যমে গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ায় বিতর্কিত এই জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান সব সময় ছিল গণমাধ্যমের শীর্ষ আলোচনায়। নানা অনিয়মে বারবার খবরের শিরোনাম হওয়া যমুনা লাইফে এখনো তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে আইডিআরএ।
হয়রানিমূলক মামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়- যমুনা লাইফে অপরাধের বিভিন্ন ইস্যুর প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালে জনৈক গ্রাহক আইডিআরএ’কে চিঠি দেন। সেই চিঠি নিয়ে দেশের কয়েকটি গণমাধ্যম সংবাদ প্রচার করে। যমুনা লাইফ এসব অভিযোগ নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কিংবা কোন যাচাই করেনি এবং তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপও গ্রহণ করে নি। পরবর্তিতে যমুনা লাইফ প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ লিপি দিলে- গণমাধ্যম সেই সংবাদের প্রতিবাদও প্রকাশ করে। অথচ ২০২৫ সালে এসে যমুনা লাইফ হঠাৎ করে ৫ জন সাংবাদিককে জড়িয়ে চাঁদাবাজির মিথ্য মামলা করে। অথচ, মামলা করার আগে উকিল নোটিশ, প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ কিংবা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে যে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়- তা কিছুই অনুসরণ করেনি যমুনা কর্তৃপক্ষ। আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই- যা প্রাথমিক তদন্ত করলেই প্রমাণিত হবে।
আইডিআরএ ঘোষিত অবৈধ সিইও বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল এসব মামলার নেপথ্যের খলনায়ক এমন দাবী করে চিঠিতে বলা হয়, যেখানে মন্ডল-সেখানেই মামলা! এর আগেও তিনি হোমল্যান্ডে থাকাকালীন একাধিক সাংবাদিকের নামে মামলা করেছেন। যমুনায় এসে আবারও হয়রানি করতে ৫ জন সাংবাদিককে সম্পূর্ণ মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলায় জড়ালেন। ভবিষৎতে সিআইডি কিংবা পিবিআইর মাধ্যমে আরো কয়েকজন সাংবাদিককে মামলায় জড়ানো হবে- এমন হুমকি দেয়া হচ্ছে। হোমল্যান্ড কিংবা যমুনা লাইফ যেখানে বিশ্বজিৎ মন্ডল দায়িত্ব পালন করেছেন- সেখানেই তিনি বীমা কোম্পানির পরিচালক হতে শুরু করে বীমা কর্মীদের অনেককেই নানা উপায়ে প্রতিষ্ঠান থেকে মামলায় জড়িয়েছেন। মন্ডলের দায়িত্বকালীন সময়ে এমন মামলার সংখ্যা কতো এবং মামলার সত্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা কি- তাও খুঁজে বের করার দাবি জানানো হয়।
মামলা কি মন্ডলের দমন-পীড়নের হাতিয়ার? এমন প্রশ্ন তুলেন চিঠিতে বলা হয়, আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যমুনার অপরাধ তুলে ধরেছি। সংবাদ প্রকাশের এক বছর পর দায়ের হওয়া এই চাঁদাবাজি মামলার সঙ্গে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানি এবং মুখ বন্ধ করার উদ্দেশ্য প্রণোদিত এ ধরণের মামলা শুধু ব্যক্তি সাংবাদিকদের নয়- পুরো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। বীমা খাতের উন্নয়নে যেখানে আইডিআরএ’র সঙ্গে গণমাধ্যমের সুসম্পর্ক, সেখানে ফ্যাসিবাদের দোষরদের এ ধরণের মিথ্যা মামলা- দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত ও দুঃসাহস বলেই ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা নিয়ে আইডিআরএর সহযোগিতা কামনা করে যমুনা লাইফ পরিচালনায় ব্যর্থ চেয়ারম্যান বদরুল আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও মামলাবাজ বিশ্বজিৎ মন্ডলের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি পদক্ষেপের দাবী জানানো হয়।
একইসঙ্গে, সারাদেশের গ্রাহক স্বার্থ রক্ষায় যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আইন লঙ্ঘন, অর্থলোপাট ও অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ভয়ংকর চিত্র উন্মোচনে- ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, দুদক, আয়কর গোয়েন্দা, আইডিআরএ’র টিম ও বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ সরকারের সকল সংস্থার একযোগে তদন্ত দাবি করেন মামলায় ক্ষতিগ্রস্থ সাংবাদিকরা।
তবে, মামলার বিষয় কিছুই জানেন না- এমন দাবী করেছেন যমুনা লাইফের চেয়ারম্যান বদরুল আলম। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা হয়েছে জানা নেই। মামলার জন্য চেয়ারম্যান বা পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি নেয়া হয় নি। কে বা কারা মামলা করেছেন- বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।
এ প্রসঙ্গে আইডিআরএর এক কর্মকর্তা বলেন, এমনিতেই অস্থির সময় পার করছে বীমা খাত। সাংবাদিকদের নামে এ ধরনের মামলা বীমা খাতকে আরো বির্তকিত করে তুলবে। সুশাসন, উন্নয়ন কিংবা ব্যবসা কোন অবস্থানেই ভালো নেই যমুনা লাইফ। তারমধ্যে মামলার বিষয়টি নতুন মাত্রা যোগ করলো। আসলে কি হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ হিসেবে আমরা খতিয়ে দেখবো।
এ প্রসঙ্গে ইকোনোমি বাংলার স্টাফ রিপোর্টার শাহাদাত হোসেন বলেন, বীমা খাতের অথরিটি হিসেবে আইডিআরএকে জানানো হয়েছে। মূলত আমরা যমুনা নিয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে নিউজ করেছি। চাঁদা তো দূরের কথা- আমি কিংবা আমার সম্পাদক কোনদিন যমুনা লাইফের অফিসে যাইনি, কারো সঙ্গে কোনদিন কথাও হয়নি। অথচ, নিউজের বছরখানেক পর আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হলো। ওদের অসংখ্য অনিয়ম ও দূনীর্তি নিয়ে গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ করতে ভূয়া মামলা করা হলো- এই অন্যায়ের প্রতিকার চাই।
বাণিজ্য বার্তার সিনিয়র রিপোর্টার রাসেল মাহমুদ বলেন, যমুনা লাইফের জালিয়াতি আর কুকীর্তি নিয়ে গণমাধ্যমে অসংখ্য সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। মামলা দিয়ে হয়রানি করে গণমাধ্যমকে ঠেকাতে চায় যমুনা লাইফ। আমরা আইডিআরএ’কে জানিয়েছি।