মিজানুর রহমান সোহেল বাংগালী,লক্ষ্মীপুর:
দ্বীনি শিক্ষার শতবছরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার জামিয়া ইসলামিয়া কলাকোপা মাদরাসা।এক সময়ের বৃহত্তর নোয়াখালী বর্তমানে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরবাদাম ইউনিয়নের অন্তর্গত চরকলাকোপা গ্রামে ১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মাদরাসাটি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দ্বীনি এলেম বিতরণ করে হাজার হাজার যুগশ্রেষ্ট আলেম, মুফতী-মুহাদ্দিস তৈরীর মধ্যদিয়ে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছেন প্রতিষ্ঠানটি। ইলমে দ্বীন চর্চার পাশাপাশি এলাকাবাসীর ধর্মীয় অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দুর প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন,ছাত্র সংখ্যার হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জামিয়া ইসলামিয়া কলাকোপা মাদরাসাটি বৃহত্তর নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার সর্ববৃহৎ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বমহলে প্রশংসনীয়।
এই প্রতিষ্ঠানকে এই অঞ্চলের সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মানুষ অন্তর থেকে ভালবাসেন। এলাকাবাসীর মধ্যে এটি দোয়া কবুলের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবেও সুখ্যাতি রয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয় একটি মহল মাদরাসাটি সুনাম ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করতে বিভিন্ন ভাবে পাঁয়তারা চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই মহলটি কিছু দিন পর-পর বিভিন্ন কাল্পনিক অজুহাত তুলে সোশাল মিডিয়া সহ নানা ভাবে অপপ্রচার চালিয়ে ছাত্রদের ক্ষেপিয়ে তোলেন। ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও শিক্ষকদের সাথে অশালীন আচরণ সহ অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা সহ শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। ক্লাস চলাকালীন সময়ে মাদরাসার ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের নানা হুমকি ধমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন,শিক্ষকদের সাথে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সাথে কটু কথা বলা সহ শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিনষ্ট করতে উঠেপড়ে লেগেছে বলে অভিযোগ করেন ম্যানেজিং কমিটির কয়েকজন সদস্য। তারা বলেন,১৩ সদস্য বিশিষ্ট এই ম্যানেজিং কমিটির মাত্র দুইজন সদস্য সব সময় ঐতিহ্যবাহী এই মাদরাসাটিকে নিজেদের কব্জায় নিতে শতবছরের ধর্মীয় এই প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন তারা।এদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করতে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনাও করেন ছাত্ররা। মাদরাসার কয়েকজন ছাত্র ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা জানান,বর্তমান মোহতামিম মাওলানা মোহাম্মদ আলী একজন বড় মাপের আলেম। তিনি আল্লামা আহমাদ শফী (রহঃ) এর বিশিষ্ট খলিফা। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছর যাবত কলাকোপা মাদরাসায় সুনামের সাথে শিক্ষকতা করে আসছেন।এর আগে তিনি এই মাদরাসার নায়েবে মোহতামিমের (ভাইস প্রিন্সিপাল) দায়িত্ব পালন করেছেন। তার হাতেগড়া ছাত্ররা আজ বাংলাদেশের বড় বড় মাদরাসার শায়খুল হাদীস ও মুহাদ্দিস হিসেবে ইলমে দ্বীনের খেদমত করছেন।
জান-যায়,স্থানীয় ধর্মপ্রাণ শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব মৌলভী মোখলেছুর রহমান এটি প্রথমে মকতব আকারে প্রতিষ্ঠা করেন।পরবর্তীতে বৃহত্তর নোয়াখালীর বিখ্যাত বুজুর্গ আলেম মরহুম মাওলানা সাইদুলহক (রহঃ) বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসার কারিকুলামে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেন। তখন এটির নাম করণ করা হয় জামিয়া ইসলামিয়া কলাকোপা মাদরাসা। শিশু শ্রেণী থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদীশ টাইটেল (মাস্টার্স) পর্যন্ত পাঠদান দেওয়া হয় এখানে। পাশাপাশি হেফজ বিভাগ ও বিশাল একটি এতিমখানা রয়েছে এই জামিয়ায়। সুপরিসর আবাসিক ছাত্রাবাসে গরীব অসহায় ও মেধাবী ছাত্রদের জন্য রয়েছে সম্পুর্ন আবাসিক থাকা-খাওয়ার সু ব্যবস্থা। বর্তমানে ৩৪ জন শিক্ষক ৭ জন কর্মচারীর তত্বাবধানে প্রায় ৯ শতাধিক ছাত্র এখানে অধ্যায়ন করছেন। আবাসিকে ৫ শতাধিক ছাত্র নিয়মিত থেকে খেয়ে এলমে দ্বীনের অনুশীলন করছেন। চলতি শিক্ষাবর্ষে ২২ জন দাওরায়ে হাদীশ (মাস্টার্স) বিভাগ থেকে খতমে বোখারী সম্পন্ন করেন।
শিক্ষার্থীরা জানান কমিটির সদস্য ইলিয়াস নামের এক সদস্য ধর্মীয় এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্র করে আসছে। তাদের বাড়ীর দরজায় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় নিজেদের কব্জায় নিতে মরিয়া হয়ে উঠেন। মাদরাসার বিরুদ্ধে নানা অজুহাত সৃষ্টি করে সুনাম নষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তার এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটি,শিক্ষক,
শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী সোচ্চার হয়ে উঠে।তারা কোন ভাবেই শতবছরের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণে নিতে দিবেনা বলে জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, কলাকোপা মাদরাসায় মূলত ইলিয়াস কে নিয়েই সমস্যা। ইলিয়াস একেক সময় একেকটা মতবাদ সৃষ্টি করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরী করে রাখে। ব্যক্তিগত ভাবে সে জামায়াত শিবিরের একজন ক্যাডার।এখন আবার আহলে হাদিস নামক এক মতবাদ আবিস্কার করে শতবছরের এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজের কব্জায় নিতে গভীর ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।অন্যদিকে আদম ব্যবসায়ী হিসেবে ইলিয়াস বেশ পরিচিত। কলাকোপা মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ইলিয়াসকে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি চায়। তারা বলেন, ইলিয়াস থাকলে মাদরাসার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলবেই।কারন সে একজন চিহ্নিত ষড়যন্ত্রকারী।
এক আলাপচারিতায় মাদরাসার বর্তমান মোহতামিম (অধ্যক্ষ) মাওলানা মোহাম্মদ আলী জানান,মাদরাসার ক্যাম্পাস ও আশপাশের বিভিন্ন মৌজায় প্রায় ৫৫ একর জমি রয়েছে এই মাদরাসার নামে। এছাড়া প্রতিনিয়ত এলাকাবাসীর দান অনুদান ছদকা-মান্নত দারা এর লিল্লাহ বোর্ডিং ও শিক্ষকদের বেতন ভাতাদি অত্যান্ত সুন্দর ও সুচারুরূপে পরিচালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) অনুমোদিত ১৩ সদস্য একটি ম্যানেজিং কমিটি প্রতিষ্ঠানটির সকল আয় ব্যয় ও উন্নয়ন-অবকাঠামো-শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ সহ যাবতীয় কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করছেন।
প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থায়নে আবাসিক ও শ্রেণি কক্ষ সংকট সমাধান করেন। নুরানী বিভাগ স্থানান্তর ও শৌচাগার সমস্যা সমাধান করতে না পারায় ছাত্রদের নিয়ে নানা হিমশিম খেতে হচ্ছে।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ম্যানোজিং কমিটির সভাপতি মাওলানা আব্দুল্লাহ আল ইসরাফিল জানান,তার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে শিক্ষক কর্মচারীদের বেতব ভাতা বৃদ্ধি,ছাত্রদের আবাসিক সংকট দূর করাসহ খাবারের মান বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত ভূতপূর্ব উন্নয়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদরাসার তহবিলও অতীতের চেয়ে রেকর্ড পরিমাণ সংরক্ষিত আছে। স্থানীয় দুইজন ব্যক্তির ধারাবাহিক অসহযোগীতার কারনে নুরানী বিভাগের জন্য স্থান নির্বাচন করেও অবকাঠামো নির্মাণ করা যাচ্ছেনা। এরা প্রতিষ্ঠানটির সুনাম সু-খ্যাতি নষ্ট করতে উঠে পড়ে লেগেছে। তারা প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি ভাবছেন যেনো। নিজেদের কব্জায় নিয়ে ধর্মীয় এই প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে তারা।
সহ সভাপতি মেজবাহ উদ্দিন ভিপি হেলালও ঐ চক্রটির হীনচক্রান্তগুলো উল্লেখ করে তা প্রতিহত করতে এলাকাবাসীর সহযোগীতা কামনা করেন।
এদিকে কমিটির সদস্য ইলিয়াসের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
কমিটির আরেক সদস্য রিয়াজের বক্তব্য জানতে চাইলে তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,আমাদের বাড়ীর দরজার এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমরা নই। আমরা সব সময় এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মঙ্গল কামনা করে আসছি। আমাদের জিবনের চেয়েও বেশী ভালবাসি প্রতিষ্ঠানকে। মাঝে মধ্যে হয়তো কিছু অনিয়ম চোখে পড়লে শিক্ষক ও ছাত্রদের সতর্ক করি। মোহতামিম-শিক্ষক মন্ডলী-ম্যানেজিং কমিটি ও এলাকাবাসী সহ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা প্রতিষ্ঠানের পড়ালেখার মান উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণ সহ শতবছরের এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম সুখ্যাতি ফিরিয়ে আনতে কাজ করছি।
রামগতি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন,ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে কোন ধরনের অপপ্রচার,সংঘাত বরদাস্ত করা হবেনা। যারাই প্রতিষ্ঠান নিয়ে অপতৎপরতা সৃষ্টির চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। এব্যাপারে পুলিশ কঠোর থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম শান্তনু চৌধুরী বলেন,কওমী মাদরাসাগুলো তাদের শিক্ষা বোর্ডের নীতিমালা মেনে চলবে। এখানে নতুন করে কোন কিছু করার চেষ্টা চালিয়ে কোন লাভ হবেনা। কেউ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করলে কাউকে একচুল পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবেনা। এব্যাপারে উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর থাকবে।